সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৭:১৮ অপরাহ্ন

নেতৃত্ব আসছে সমঝোতায়

নেতৃত্ব আসছে সমঝোতায়

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন ১১-১২ মে। এবারের সম্মেলনে নতুন নেতৃত্ব আসছে সমঝোতায়। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেও এ বিষয়ে বক্তব্য এসেছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এ সমঝোতা হবে, তা স্পষ্ট নয়।

এছাড়া এবারের সম্মেলনে সর্বোচ্চ বয়সসীমা, নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া, অঞ্চলভিত্তিক প্রাধান্যসহ বেশকিছু বিষয় নিয়েও পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছে বিভ্রান্তি। প্রায় দুই সপ্তাহ পরও গঠিত হয়নি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি। আটকে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিও। এর মধ্যেই শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলে জানিয়েছে ছাত্রলীগ সূত্র।

এবারের সম্মেলন ঘিরে বেশি নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’ তবে অতীত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কখনোই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে নেতৃত্ব নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই তিনি উৎসাহিত করেছেন।

তবে ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে ভোট নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এক যুগ ধরে ছাত্রলীগের ওপর সিন্ডিকেটের প্রভাবকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের শুরু। ফলে এবারের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোট হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে।

এছাড়া নেতৃত্ব নির্বাচনে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলছেন, পূর্ববর্তী সম্মেলনগুলো বিবেচনায় নিয়ে বয়সসীমা ২৯ ধরেই কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫নং ধারার ক-অনুচ্ছেদে সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ২৭ বছর।

২০১৫ সালের ২৫ জুলাই ছাত্রলীগের ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলন বিলম্বিত হওয়ায় (দুই বছরের কমিটি চার বছর) নেতৃত্বের বয়স ২৭ থেকে ২৯ বছর করে দেন। এবার কম সময়ের ব্যবধানে সম্মেলন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নিয়মিত ছাত্রদের নেতৃত্বে আনার পক্ষে, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ঠিক করে দেয়া ২৭ বছর বয়স এবারও বহাল থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে সম্প্রতি গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাব ফরম ছাড়া হয় গেছে। প্রার্থীদের সবাইকে নিয়ে বসা হয়, সমঝোতার চেষ্টা করা হয়, যদি সমঝোতা না হয়, ভোট হয়। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু এরা ইয়াং ছেলেপেলে, তাদের মধ্যে অন্য রকম উদ্দীপনা থাকবে। ভোটের ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে, এটাও দেখতে হবে। আমরা চাই উপযুক্ত নেতৃত্ব এবং ছাত্র।

তিনি বলেন, একটা বয়সসীমাও বাঁধা আছে। এই বয়সসীমার মধ্যে প্রকৃত ছাত্র ও মেধাবীরা নেতৃত্বে আসুক, এটা আমরা চাই। যদি দেখা যায় ভোটের মধ্যে উল্টাপাল্টা আসে, সেটা নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য হবে না। এটাও মাথায় রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে একটি কড়া নির্দেশনা রয়েছে। সমঝোতাকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি ‘লোক দেখানো ভোট’র মাধ্যমে অযোগ্যদের যাতে প্রতিষ্ঠিত করা না হয়, সেজন্যও তিনি একটি শক্ত বার্তা দিয়েছেন। নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে ছাত্রলীগের ‘নতুন মডেল’ গড়ার নির্দেশনাও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। অনেকে মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী হয়তো সমঝোতার মাধ্যমে দু’জনকে মনোনীত করা হবে এবং তাদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হবে।

২৮তম জাতীয় সম্মেলনে ছাত্রলীগের সিন্ডিকেটের মধ্যস্থতায় সমঝোতার মাধ্যমে সোহাগ-জাকিরকে মনোনীত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদেরই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। সেখানে অন্য কোনো প্যানেলও তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। এদিকে ২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি চাই ত্যাগী, যোগ্য নেতৃত্ব। কারও পকেটের কমিটি দিয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব হবে না। কোনো সিন্ডিকেট দিয়ে ছাত্রলীগ চলবে না। ছাত্রলীগ চলবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে শেখ হাসিনার নির্দেশনায়। এর বাইরে কোনো ভাবনাচিন্তার অবকাশ নেই।’

নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে যা আছে ভাবনায় : জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ছাত্রলীগের এ সম্মেলনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরই পদপ্রত্যাশীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হাইকমান্ড থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি দলীয় সোর্সও কাজ করছে তথ্য সংগ্রহে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেওয়াজ অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রাধান্য পাবে অঞ্চল। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেয়া হবে। সাধারণত ছাত্রলীগের ৪টি পদকে শীর্ষ পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেগুলো হল- কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

এ চারটির মধ্যে দুটি পদ বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে এবং বাকি দুটি অন্য অঞ্চল থেকে রাখা হয়। যেহেতু দুই যুগ ধরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বরিশাল থেকে কেউ আসছে না, সেক্ষেত্রে এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে এ অঞ্চলটি প্রাধান্য পেতে পারে। আর বর্তমান সভাপতি যেহেতু ফরিদপুর অঞ্চলের, তাই এ অঞ্চল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব আসতে পারে। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে যেসব এলাকা থেকে নেতৃত্ব আসছে না, সেসব অঞ্চলকে প্রাধান্য দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে একজনকে এ চারটি পদের একটিতে আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। চার পদের একটিতে আসতে পারেন একজন নারীও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। এর বাইরে শীর্ষ ৪টি পদের অন্তত একটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল অঞ্চল থেকে একজন নেতৃত্বে আসতে পারেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি একেএম এনামুল হক শামীম যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের অভিভাবক। তিনি যেভাবে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেভাবেই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব আসবে।’

তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ সবসময় ছাত্ররা করে, বয়সসীমাও নির্ধারণ করা আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়া কেউ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসে না। এর বাইরে ক্লিন ইমেজ, পারিবারিক ঐতিহ্য, ছাত্র কিনা, বয়স ঠিক আছে কি না, সংগঠনের প্রতি কমিটেড কিনা, আগে কী অবস্থান ছিল, সংগঠনের প্রতি কী ত্যাগ- এগুলোই দেখা হবে।’

আটকে আছে ঢাবি ও দুই মহানগরের কমিটি : এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন হয় ২৯ এপ্রিল এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের সম্মেলন হয় ২৫ ও ২৬ এপ্রিল। এর আগে ২০১৫ সালের ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলন শেষে ১৮ জুন আবিদ আল হাসানকে সভাপতি এবং মোতাহার হোসেন প্রিন্সকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি করা হয়।

২০১৫ সালের ২৮ মে ঢাকা মহানগর উত্তরের সম্মেলন শেষে ৩০ মে মিজানুর রহমানকে সভাপতি ও মহিউদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে শাখাটির ৬ সদস্যের কমিটি করা হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে ৩০ মে সম্মেলন শেষে ওই দিনই বায়েজিদ আহমেদ খানকে সভাপতি ও সাব্বির হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮ সদস্যের নতুন কমিটি করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কমিটি গঠিত না হওয়ায় ঢাবির বিভিন্ন হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাইরেও ৩-৪টি করে গ্র“প তৈরি হয়েছে।





© All rights reserved © 2017 alltimenewsbd24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com